বঙ্গবন্ধু টানেল উজ্জল সম্ভাবনার দুয়ার

বঙ্গবন্ধু টানেল উজ্জল সম্ভাবনার দুয়ার

বঙ্গবন্ধু টানেল উজ্জল সম্ভাবনার দুয়ারঃ

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে দেশের ইতিহাসে প্রথম টানেল নির্মাণ হচ্ছে। এরইমধ্যে নদীর উভয় প্রান্তে ৪ মুখ নিয়ে টানেলের দুটি টিউবের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। চীনের সাংহাই শহর এর আদলে চট্টগ্রাম শহরকে “ওয়ান সিটি টু টাউন” রূপে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার প্রকল্পটি গ্রহণ করে। টানেল এর নামকরণ করা হয় “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল”। এ টানেল দেশের ফাস্ট ট্র্যাক মেগা প্রকল্প গুলির অন্যতম। ৭ অক্টোবর ২০২১ টানেলের দ্বিতীয় টিউবের খনন কাজ শেষ হয়।

টানেলের নির্মাণ শুরুঃ

৯০ - এর দশকে জাপান ভিত্তিক উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান “জাইকা” কর্ণফুলী নদীতে ব্রিজ নির্মাণের পরিবর্তে টানেল নির্মাণের সুপারিশ করে। কিন্তু নানা জটিলতা আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে এ টানেল বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৮ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে দেশের প্রথম টানেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন।
২০১১ সালে প্রথম টানেল নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাইসহ আনুষঙ্গিক বিষয় ঠিক করতে চায়না কমিউনিকেশন্স কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (CCCC) প্রকল্পটির পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ৬-১১ জুন ২০১৪ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরকালে দেশটির সরকারকে টানেল নির্মাণে অনুরোধ করেন। ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং- এর বাংলাদেশ সফরকালে ১৪ অক্টোবর ২০১৭ বাংলাদেশ সরকার (অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ) ও চীন সরকারের (এক্সিম ব্যাংক অফ চায়না) - এর মধ্যে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
একই দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শি জিন পিং যৌথভাবে টানেল নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পতেঙ্গা মুখ থেকে কর্ণফুলী দক্ষিণ পাড়ের আনোয়ারা মুখ পর্যন্ত প্রথম টিউবের খনন কাজ উদ্বোধন করেন।

Tunnel Fact File: টানেল নির্মাণ তথ্যঃ

টানেলের নামঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল (Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Tunnel) | অবস্থানঃ পতেঙ্গা ও আনোয়ারা, চট্টগ্রাম | যেই নদীর তলদেশঃ কর্ণফুলী | মূল টানেলের দৈর্ঘ্যঃ ৩.৪ কিমি | টানেলের উভয় প্রান্তে সংযোগ সড়কঃ ৫.৩৫ কিমি | টানেল যুক্ত করবেঃ চট্টগ্রাম নগরকে আনোয়ারা উপজেলার সঙ্গে | নির্মাণ শুরুঃ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | উন্মুক্ত কালঃ ২০২২ সাল | যানবাহন চলাচলঃ পণ্যবাহী ট্রাক, বাস ও মোটর গাড়ি | নির্মাতা প্রতিষ্ঠানঃ চায়না কমিউনিকেশন্স কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (CCCC)।

টানেলের টিউবঃ

টানেলের ভেতর দুটি টিউবে যানবাহন চলবে ওয়ানওয়ে পদ্ধতিতে। প্রতিটি টিউবের দৈর্ঘ্য ২.৪৫ কিলোমিটার, ভেতরের ব্যাস ১০.৮০ মিটার বা ৩৫.৪ ফুট, বাইরের ব্যাস ১২.১২ মিটার বা ৩৯.৮ ফুট এবং উচ্চতা ৪.৮ মিটার ১৬ ফুট। একটি টিউব থেকে অপর টিউবের পাশাপাশি দূরত্ব প্রায় ১২ মিটার। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে ১৮ থেকে ৩১ মিটার গভীরতায় দুটি সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়। পতেঙ্গা থেকে আনোয়ারা পয়েন্টে প্রথম সুড়ঙ্গ খননের কাজ শেষ হয় ২ আগস্ট ২০২০। আনোয়ারা থেকে পতেঙ্গা পয়েন্টে দ্বিতীয় সুড়ঙ্গটির খনন কাজ শুরু হয় ১২ ডিসেম্বর ২০২০ এবং শেষ হয় ৭ অক্টোবর ২০২১।

টানেলের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানঃ

টানেল নির্মাণ করেছে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন্স কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (CCCC)। ২২ ডিসেম্বর ২০১৪ CCCC এর সঙ্গে - সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ৩০ জুন ২০১৫ CCCC ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

টানেলের নির্মাণ ব্যয়ঃ

প্রাথমিকভাবে টানেল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৮,৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। পরবর্তীতে ব্যয় বেড়ে ৯৮৮০.৪০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এ কাজে চীনের এক্সিম ব্যাংক ঋণ সহায়তা দেয় ৫,৯১৩.১৯ কোটি টাকা। অবশিষ্ট অর্থ যোগান দেয় বাংলাদেশ সরকার। 

টানেলের সুবিধাঃ

কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম শহর কে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। এক ভাগে রয়েছে নগর ও বন্দর এবং অন্য ভাগে রয়েছে ভারী শিল্প এলাকা। টানেল বাস্তবায়ন শেষ হলে এটি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। টানেল চালু হলে চট্টগ্রামের পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন বেগবান হবে।
> টানেল দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামগামী যানবাহনকে চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করতে হবে না। সিটি আউটার রিং রোড হয়ে টানেলের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে।
> চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব কমবে ১৫ কিলোমিটার।
> কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ি এলাকায় গভীর সমুদ্রবন্দর হচ্ছে। বাঁশখালীতে হচ্ছে কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। মহেশখালীতে হয়েছে সিএনজি স্টেশন। আনোয়ারা হচ্ছে বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এসব প্রকল্পের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধু টানেল।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url