বাংলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বিনোদন বিলুপ্ত প্রায়

বাংলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বিনোদন বিলুপ্ত প্রায়

বাংলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বিনোদন বিলুপ্ত প্রায়ঃ

বর্তমান সময়ে প্রায় বিলুপ্তির পথে বাংলা ও বাঙালির প্রাচীন সময়ের ঐতিহ্যবাহী বিনোদন মাধ্যম গুলো। গ্রাম বাংলার জনসাধারণের চিত্তবিনোদনের চিরচেনা সেসব বিনোদনের বিষয়গুলো বর্তমানে গভীর অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। সৃজন ও মনন চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা গ্রামীণ লোকঅনুষঙ্গগুলো এখন মাত্র শুধুই ইতিহাস। সে সব হারিয়ে যাওয়া গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিনোদন মাধ্যম সম্পর্কে আজকের এই লেখা।

যাত্রাপালাঃ

এখন শীতের সময় সন্ধ্যা নামলেই মেলার মাঠ থেকে লাউডস্পিকারে আর ভেসে আসে না “হৈ হৈ কান্ড, রৈ রৈ ব্যাপার … নাচে গানে মন মাতবে সবার… অদ্য রজনীর বিশেষ আকর্ষণ… ”। যাত্রাপালা দেখার জন্য দর্শক সারা রাত বিনিদ্র থাকার প্রস্তুতি নিয়ে আর অপেক্ষায় থাকে না। শীতে মেলা বসবে, যাত্রাপালা আসবে … সেই প্রতীক্ষায় থাকে না আর গ্রাম-বাংলার মানুষ। যাত্রাশিল্পের এখন ঘোর দুর্দিন। বর্তমানে দেশে যাত্রাপালার অনুমোদন অঘোষিতভাবে বন্ধ।
যাত্রাপালা আয়োজনে জেলা প্রশাসনের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। কিন্তু যাত্রার কথা শুনলেই প্রশাসন আর অনুমোদন দিচ্ছে না। পালা মঞ্চস্থ না হওয়ায় এসব মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। অনেকেই চলে গেছেন অন্য পেশায়। অনেক দক্ষ অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক, বাদক পালাকার চলে গেছেন দল ছেড়ে। ফলে ক্রমেই রুগ্ন, ক্ষয়িষ্ণু,নিস্প্রভ হয়ে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী যাত্রার জৌলুস।

অন্যদিকে আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, হাতের মুঠোয় বিনোদনের সহজলভ্যতার আবর্তে পড়ে বাঙালির লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য এই যাত্রাপালা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। যাত্রা দলগুলোকে প্রতিবছর শিল্পকলা একাডেমির কাছ থেকে নিবন্ধন নবায়ন করতে হয়, যা “দলের লাইসেন্স” হিসাবে গণ্য। কিন্তু নাম নিবন্ধন করে লাভ কি? পালা তো মঞ্চায়ন করা হয় না। তাই দলও গঠন করা হয় না।

পুতুলনাচঃ

“হেলায় সুযোগ হারাবেন না। চলে আসুন আমাদের প্যান্ডেলে। এখনই শুরু হবে “জব্বর” পুতুলনাচ। পুতুল নাচ দেখে আনন্দ চিত্তে বাড়ি ফিরে যান।” গ্রাম-বাংলার চিরচেনা এমন সংলাপ এখন আর শোনা যায় না। বসে না কোথাও পুতুলনাচের এমন কোন প্যান্ডেল।
ঐতিহ্যবাহী এই পুতুল নাচ বাঁচাতে নেই কোন উদ্যোগ। দুই একটা স্থানে কালেভদ্রে হলেও এখন আর পুতুলনাচের লোকসমাগম নেই। তাই পুতুল নাচের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই জীবন বাঁচাতে বেছে নিয়েছেন বিকল্প ব্যবস্থা। কেউ মুদির দোকান নিয়ে ব্যস্ত, কেউ আচার বা ঝাল মুড়ি বিক্রি করছেন, আবার কেউ বেকার বসে আছেন। জীবনের সব সম্বল হারিয়ে এখন পুতুলনাচের উদ্যোক্তারা অসহায় জীবন যাপন করছেন। গ্রাম-বাংলা সংস্কৃতির ঐতিহ্য মন্ডিত পুতুলনাচকে আধুনিক রূপ দেবে এমন উদ্যোগী এখন আর কেউ নেই।
মৃতপ্রায় শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেই বলে জানিয়েছেন পুতুলনাচ শিল্পীরা। শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, ঢাবি ও জাবি নাট্যকলা বিভাগ দীর্ঘদিন যাবৎ এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে কাজ করলেও মাঠ পর্যায়ের শিল্পীরা আর্থিক সহযোগীতা না পাওয়ায় দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে পুতুলনাচ।
পুতুলনাচের দলগুলোকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় না আনা এবং শিল্পী- কলাকুশলীদের উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রদর্শনের ব্যবস্থা না করা হলে পুতুল নাচ বিলীন হয়ে যাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। 

সার্কাসঃ

যাত্রাপালা ও পুতুল নাচ প্রদর্শন অনিয়মিত হলেও সে তুলনায় সার্কাস প্রায় বন্ধ। যাত্রার মতই সার্কাসেও একটি প্রধান সমস্যা প্রশাসনিক অনুমোদন। এই অনুমোদন পাওয়া দুরহ ব্যাপার। সার্কাসের দল টিকিয়ে রাখাও খুব ব্যয়বহুল। সার্কাসের বিভিন্ন কসরতের জন্য দক্ষ জনবল প্রয়োজন, প্রয়োজন তাদের নিয়মিত অনুশীলন। সে কারণে দল ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেলে আবার সার্কাসে ফিরে আসা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ দলে থেকে জীবিকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই অনেকে দল ছেড়ে চলে গেছেন।
অধিকাংশ সার্কাসের দল এভাবেই বিলুপ্ত হয়েছে। এখন নামে মাত্র তিন চারটি দল টিকে আছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজবাড়ী জেলায় চর্চা চলত সার্কাসের। এই জেলায় গড়ে উঠেছে দেশের সবথেকে বড় অ্যাক্রোবেটিক সেন্টার। দেশ-বিদেশে এই জেলার অ্যাক্রোবেটিকদের সুনাম রয়েছে। তবে তেমন করে এই মাধ্যমের শিল্পীদের নিয়ে ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেই বললেই চলে। কোনরকম জীবন যাপন করছেন সার্কাসের শিল্পীরা। অন্যদিকে সার্কাসের উপযোগী বড় ও স্থায়ী মাঠও নেই।

বায়োস্কোপঃ

এক সময়কার গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিনোদন ছিল বায়োস্কোপ দেখা। এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না সেই বায়োস্কোপ। বায়োস্কোপ দেখিয়ে শিশু সহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের আনন্দ দেওয়ার মাধ্যমে নিজের সংসার চালাত এই পেশায় নিয়োজিত মানুষ। এই বিনোদনের মাধ্যম আজ বিলুপ্তির পথে। এই পেশার মানুষেরা পেশা বদলিয়ে অন্য পেশায় নিযুক্ত হয়েছেন। আজ তারা জীবন বাঁচানোর তাগিদে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করছেন।

গাজীরপটঃ

গাজীরপট এক প্রকার লোকচিত্রকলা। এতে গাজী পীরের উপাখ্যানের বিভিন্ন দৃশ্য চিত্রায়িত হয় এবং সঙ্গীত যোগে পটুয়ারা/শিল্পিরা এগুলো পরিবেশন করেন। গাজীরপট এর পাশাপাশি মনসাপট, রামায়ণপট, কৃষ্ণপট, ইত্যাদিও একসময় প্রচলিত ছিল। বর্তমানে বিনোদনের বিভিন্ন আধুনিক মাধ্যম প্রচলিত হওয়ায় এ মাধ্যমটি বিলুপ্তপ্রায়। দু-একটি দৃষ্টান্ত ব্যতিরেকে ওইসব পটের নিদর্শন আজ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। পটশিল্পীদের সবাই বেদে সম্প্রদায় ভুক্ত এবং ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। গাজীর পট সাধারণত গ্রামগঞ্জে বাড়ির উঠানে প্রদর্শিত হয়ে থাকে। শিল্পীরা জুড়ী, ঢোল, চটি প্রভৃতি বাজিয়ে গান গায় আর পট প্রদর্শন করে।

ভাটিয়ালি ও পুথিপাঠঃ

বাংলা লোকসংগীত এর শক্তিশালী একটি “ঐতিহ্যবাহী” ধারা ভাটিয়ালি গান। প্রযুক্তির নানা সুবিধার কারণে এবং এসব গান সংরক্ষণের অভাবে এখন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তবে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এসব গান সংরক্ষণ করা খুবই প্রয়োজন। আর লোকসাহিত্যের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে পুথিপাঠ। সৃজনশীলতা, মানবভাবনা এবং কাব্যত্ব না থাকার কারণে এ যুগের পাঠক তা আর পাঠ করে না। তবে এখনো গ্রাম-বাংলার কোথাও কোথাও পুঁথিপাঠের আসর বসে।

নৌকাবাইচঃ

নৌকাবাইচ শুধুমাত্র গ্রামবাংলার ঐতিহ্যই নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির অতি প্রাচীন একটি অঙ্গও বটে। কিন্তু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব আর আধুনিকতায় ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিযোগিতাটি আজ বাংলার ঐতিহ্য থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। নৌকাবাইচকে ঘিরে একসময় কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর দুই পাড়ে নামত লাখো মানুষের ঢল। পদ্মা নদীবিধৌত রাজবাড়ীর গোদার বাজারেও নিয়মিত হতো নৌকাবাইচ উৎসব। বর্তমানে নদীতে পর্যাপ্ত পানির অভাব ও রাজনৈতিক মতৈক্যের কারণে বিলুপ্তির পথে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। তবুও থেমে নেই, গ্রামবাসীর উদ্যোগে এখনো হচ্ছে সুস্থ বিনোদনের এই উৎসব।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url