মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারক জোহান্স গুটেনবার্গের জিবন কাহিনী

মুদ্রণ যন্ত্রের আবিষ্কারক জোহান্স গুটেনবার্গের জিবন কাহিনী

মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারক জোহান্স গুটেনবার্গের জিবন কাহিনীঃ

মুদ্রণ যন্ত্রের আবিষ্কারক হিসেবে জোহা গুটেন্সবার্গের নাম কে না জানে। এই জার্মান বৈজ্ঞানিক পৃথিবী বিখ্যাত। ১৪০০ সালে জার্মানির এক ভদ্র পরিবারের তার জন্ম। ছোটবেলায় ভালোভাবে লেখাপড়া শেখার সুযোগ তেমন পাননি তিনি। তাই বাবার ব্যবসাকেই সঙ্গী করে জীবন শুরু করেন। জোহান্স গুটেনবার্গ ছিলেন একজন খুব ভালো শিল্পী।
ব্যবসায়েও খুব ভালো ছিলেন জোহান্স গুটেনবার্গ। বাজারে তার সুনাম ছিল সব ব্যবসায়ী হিসেবে। জোহান্স গুটেনবার্গ এর নেশা ছিল তাস খেলায়। তিনি অবসর সময় পেলেই তার স্ত্রী এনার সঙ্গে তাস খেলতে বসে যেতেন। আজকের মত তখন ভালো তাস পাওয়া যেত না, তাই শিল্পীরাই মোটা কাগজ কেটে তার উপর তাসের ছবি আঁকতেন। তখনই তাস খেলতে খেলতে গুটেনবার্গ এর মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। তিনি ভাবলেন খুব সুন্দর করে এক বান্ডিল আঁকবেন। ব্যাস এই কথা মনে হতেই তিনি খেলা বন্ধ করে মেতে গেলেন তাস আঁকাতে।

২-৩ খানা তাস আঁকার পরই তিনি ভাবলেন, দূর এইভাবে এত কষ্ট করে কি তাস আঁকা যায়? কিভাবে যন্ত্রের দ্বারা ছবি আঁকা যায় সেই ভাবনায় করতে লাগলেন তিনি। জোহান্স গুটেনবার্গ রং তুলি ফেলে তিনি গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসলেন। অনেক চিন্তা ভাবনা করে তিনি কাঠের ব্লক তৈরি করলেন। সেই কাঠের ব্লক এর উপর কালি মাখিয়ে তা কাগজের ওপর চাপ দিলেন। এতে সত্যিই সুন্দর তাসের ছবি পাওয়া গেল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলেন গুটেনবার্গ। তিনি অনেকগুলো কাঠের ব্লক তৈরি করে প্রচুর তাস তৈরি করলেন এবং বন্ধুদের মাঝে আনন্দ নিয়ে তা বিলাতে লাগলেন।
কাঠের ব্লকে তাস ছেপে তিনি খুব খুশি হলেন। শিল্পীমনের চিন্তার শেষ নেই। এবার ভাবলেন অন্য কিছু। গুটেনবার্গ মনে মনে ঠিক করলেন কাঠের উপর মহাপুরুষের ছবি এঁকে ব্লক করলে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ, সঙ্গে সঙ্গে তিনি কাজে লেগে গেলেন। এই মহাপুরুষের ছবির নিচে কাঠের এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে কেটে অক্ষরের ব্লক তৈরি করে মহাপুরুষের সংক্ষিপ্ত জীবনের কথা ছেপে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন।
এইভাবে তিনি বেশ কয়েক জন মহাপুরুষের ছবি তৈরি করে দোকানে রেখে দিলেন। জোহান্স গুটেনবার্গ এর দোকানে অনেক ভালো ভালো লোকজন আসতেন, তারা তার গুণ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। অনেক অনেক দাম দিয়ে ছবিগুলো কিনে নিলেন। হাতের কাছে ব্লক তৈরি থাকার জন্য জোহান্স গুটেনবার্গ অল্প সময়ের মধ্যে সাদা কাগজে ছাপ দিয়ে ছবি তৈরি করে বিক্রি করতেন।
প্রথমে তিনি কাঠের ফলকে ছবি ও লেখা একে ফেলতেন এরপর প্রয়োজন মতো অংশটা রেখে বাকি কাঠটা কেটে ফেলতেন। এই সোজা ব্লকটা আর একটা কাঠের ফলকে চাপ দিয়ে উল্টো ব্লক তৈরি করে নিতেন। এই পরের ব্লকটাই হতো কিন্তু আসল ব্লক। একদিন জোহান্স গুটেনবার্গ এর দোকানে এক পাদ্রী এলেন। তিনি জোহান্স গুটেনবার্গ এর কান্ড দেখে তো অবাক। তিনি বেশ কয়েকটা ছবি কিনে নিলেন। পাদ্রী সাহেব ভাবলেন তা মহাপুরুষের জীবনী যদি আরেকটু বড় করে লিখে জনসাধারণের মধ্যে বিলি করা যায় তাহলে দেশের মানুষের খুবই উপকার হবে, তারা জানতে পারবে ও শিখতে পারবে।
পাদ্রী সাহেব একজন মহাপুরুষের জীবনী লিখে নিয়ে হাজির হলেন জোহান্স গুটেনবার্গ এর কাছে, তিনি বললেন যেমন করে হোক এগুলো ছাঁপিয়ে দিতে হবে, তার জন্য যা খরচ হবে সবই তিনি দেবেন। গুটেনবার্গ তো মহা বিপদে পড়লেন। ভাবলেন কি করে এই সমস্যার সমাধান করবেন। তবে মুখে কিছুই বললেন না। কয়েক মাস ধরে তিনি অসম্ভব পরিশ্রম করে কাঠের উপর একটার পর একটা করে খোদাই করলেন অক্ষরের উল্টো প্রতিলিপি। তিনি এই ভাবে ৬৪ খানা ব্লক তৈরি করে একদিন প্রকাশ করলেন ৬৪ পৃষ্ঠার মহাপুরুষের জীবনী গ্রন্থ। যা সবাইকে অবাক করে দিলো। কারণ এর আগে কোন বই ছাপা অক্ষর এ বের হয়নি। পৃথিবীতে এটাই হচ্ছে প্রথম ছাপা বই।
এই বইটি ছাপার পর থেকে জোহান্স গুটেনবার্গ এর উৎসাহ আরো বেড়ে গেল। তিনি ঠিক করলেন এবার বাইবেল ছাপাবেন। তিনি, তার স্ত্রী এনা ও আরো কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে আরম্ভ করলেন কাজ। কিন্তু কাজ আরম্ভ করার মুখেই ঘটলো এক বিপদ। সবে মাত্র কয়েক পৃষ্ঠার ব্লক তৈরি হয়েছে, তা পরীক্ষা করতে গিয়ে হাত ফসকে ব্লকগুলো পড়ে গেল। ব্যস সঙ্গে সঙ্গে ওগুলো সব ভেঙে গেল। কারণ এই ব্লকগুলো ছিল খুবই পাতলা কাঠের। এই ঘটনায় জোহান্স গুটেনবার্গ খুবই হতাশ হয়ে পড়লেন। তবুও আশা ছাড়লেন না তিনি। ভাবলেন এমন একটা উপায় বার করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে আর এমনটি না ঘটে।
কিভাবে এই কাজ করা যায়? এ কথা ভাবতে ভাবতে জোহান্স গুটেনবার্গ এর এক নতুন চিন্তা মাথায় এলো। তিনি এবার কাঠের উপর অক্ষর খোদাই না করে কেবলমাত্র কাঠের অক্ষর তৈরি করতে শুরু করলেন। অনেক অক্ষর তৈরি করে এবার কাঠের ফলকে লেখার মত সাজিয়ে নিলেন। তারপর তাতে কালি মাখিয়ে কাগজের উপর চাপ দিলেন। গুটেনবার্গ দেখলেন এতে ছাপার কাজের সুবিধা বেশি। এরপর তিনি এই কাঠের অক্ষরগুলোর নাম দিলেন টাইপ।
কাঠের টাইপ কয়েক বার ছাপ দেওয়ার পর ভোতা হয়ে যায় বলে পরের দিকে তিনি ধাতুর তৈরি টাইপ ব্যবহার করতেন। ১৪৫০ সালে জোহান্স গুটেনবার্গ টাইপ আবিষ্কার করেন, তারপরই বাইবেল ছাপা হয়। যে বিজ্ঞানী এত বিস্ময়কর জিনিস আবিষ্কার করলেন, তার জীবনে কিন্তু অভাব কাটেনি। কারণ তার ও তার স্ত্রী এনার ব্যাবসায়িক বুদ্ধি ছিল না। তারা ইচ্ছা করলে বাইবেল ও অন্যান্য বই ছেপে প্রচুর আয় করতে পারতেন।
জোহান্স গুটেনবার্গ তার নিজের সবকিছু দিয়ে তৈরি করেছিলেন এই ছাপাখানা। শেষ বয়সটা তার খুবই কষ্টে কাটে। তার স্ত্রী এনা মারা যাবার পর তিনি আবারও ভেঙে পড়েন। কাজের যে উৎসাহ সেটাও তার কমে যায়। সে সময় পাদ্রী সাহেব দয়া করে তাকে অল্প কিছু টাকা পেনশনের ব্যবস্থা করে দেন। এই পেনশনের টাকার ওপর নির্ভর করেই তিনি বাকি জীবন কাটান।
জোহান্স গুটেনবার্গ এর কাঠের টাইপ আজও বিজ্ঞান জগতের শ্রেষ্ঠ অবদান। তার সময়ে ৬৪ পৃষ্ঠার জীবনীগ্রন্থ এবং বাইবেলকেও বিস্ময়কর ঘটনা ছাড়া ভাবা যায় না। এই বিজ্ঞানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ১৪৬৮ সালে।
পৃথিবীতে ছাপাখানার অনেক আধুনিক উন্নতি হয়েছে। ১৮৮৬ সালে ওটসার মারগেন থ্যাসার নামে এক আমেরিকান যন্ত্রবিদ লাইনোটাইপ যন্ত্র আবিষ্কার করেন। পরে অবশ্য মনোটাইপ, অফসেট আবিষ্কার হয়ে মুদ্রণ শিল্পকে উন্নত করেছে। তবে জোহান্স গুটেনবার্গ হচ্ছে মুদ্রণ শিল্পের প্রথম ও প্রধান জন্মদাতা। 
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url