মরণোত্তর চক্ষুদান সম্পর্কে কিছু কথা

মরণোত্তর চক্ষুদান সম্পর্কে কিছু কথা

মরণোত্তর চক্ষুদান সম্পর্কে কিছু কথাঃ

মরণোত্তর চক্ষুদান বা অন্ধজনকে দৃষ্টিদান এখন আর কল্পকথা নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেক দুর এগিয়েছে। সে কারনে চোখ দান করে এখন দৃষ্টিহীনকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।
চক্ষুদান কথাটা সম্পর্কে অনেকের ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে ভাবতে পারেন চক্ষু গোলকটাই বোধ হয় অন্যের কাছ থেকে নিয়ে দৃষ্টিহীন ব্যক্তির চোখে বসানো হয়। আসলে তা সত্য নয়। তবে হ্যাঁ, মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে অবশ্য পুরো চক্ষু গোলকটাই সংগ্রহ করা হয়, তারপর মাপ মতো কর্নিয়া কেটে নিয়ে অন্ধ ব্যক্তির কর্নিয়াতে প্রতিস্থাপন করা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে কর্নিয়া গ্রাফটিং, কর্নিয়া ট্রান্সপ্লান্টেশন বা অপটিক্যাল কেরাটোপ্লাষ্টি।

মরণোত্তর চক্ষুদান কেবল তারাই করতে পারেন যাদের কর্নিয়া সম্পূর্ণ সুস্থ থাকে বা রয়েছে। চোখের অন্য অংশ সুস্থ হলেও ক্ষতি নেই- যাদের ছানি আছে বা যারা মোটা চশমা পরেন কিংবা যারা রেটিনার অসুখে অন্ধ তারা সবাই চোখ দান করতে পারেন যদি তাদের কর্নিয়াটি সম্পূর্ণ সুস্থ থাকে। তবে যারা কোনো সংক্রামক রোগ যেমন- জন্ডিস, জলাতঙ্ক অথবা ক্যান্সার কিংবা সিফিলিস, কুষ্ঠ, এইডস ইত্যাদি রোগে বুঝছেন তারা চোখ দান করতে পারবেন না। মৃত্যুর কারণ অজ্ঞাত হলেও সে চোখ ব্যবহার করা হয় না।
মৃত মানুষের চোখ মৃত্যুর পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে সংগ্রহ করতে হবে। আই ব্যাংক এ নাম নথিভুক্ত করা থাকলে ভালো, না থাকলেও কিছু যায় আসে না। আপনার সদিচ্ছাই যথেষ্ট এবং মৃত্যুর পূর্বে এ ব্যাপারে আপনার ভূমিকাও থাকতে হবে। আপনি যদি মৃত্যুর আগে চক্ষুদানের লিখিত অঙ্গীকার নাও করে যেতে পারেন, তবুও আপনার আত্মীয়রা আই ব্যাংক এ খবর দিলে তারা এসে চোখ নেওয়ার ব্যাপারে কার্যক্রম শুরু করবে এবং নিয়ে যাবে।
একটি কথা মনে রাখতে হবে, শুধুমাত্র কর্নিয়ার কারণে কেউ অন্ধ হলে মৃত ব্যক্তির চোখের কর্নিয়ার সাহায্যে অস্বচ্ছ কর্নিয়া পরিবর্তন করা সম্ভব হয়। কিন্তু অন্য কোনো কারণে চোখ অন্ধ হলে মৃত মানুষের চোখ কোনো কাজে আসবে না। কারণ সম্পূর্ণ চোখ বদলানো কখনোই সম্ভব নয়।
১৯৪৫ সালে বিশ্বে প্রথম আই ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকার নিউইয়র্কে। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ডা. আর প্যাটন। কিছু দিনের মধ্যে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই আই ব্যাংক স্থাপিত হয়। আমাদের দেশে এ ব্যাপারে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে সন্ধানী। চোখ সংগ্রহের পরিসংখ্যান যদিও খুব বেশি নয় তবু এ ব্যাপারে আগের থেকে অনেক সচেতনতা বাড়ছে।
বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও গুণীজনেরা এ কাজে এগিয়ে এসে বড় ভূমিকা রাখছেন। চক্ষু দানের ক্ষেত্রে মৃত মানুষের চোখ সংগ্রহ করে তা জীবাণুমুক্ত করে কম তাপমাত্রায় তাপ অপরিবাহী থার্মোফ্লাক্স জাতীয় পাত্রের মাধ্যমে আই ব্যাংক এ নিয়ে যাওয়া হয়। তা আবার জীবাণুমুক্ত করে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রেখে দেওয়া হয় রেফ্রিজারেটর এর মধ্যে। এ পদ্ধতির নাম ময়েস্ট চেম্বার মেথড। এ পদ্ধতিতে চোখ ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত অবিকৃত থাকে। এরমধ্যে আগে থেকে নির্বাচন করে রাখা দৃষ্টিহীন রোগীর চোখে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়।
কর্নিয়ার কারণে দৃষ্টিহীন ব্যক্তি আগে থেকেই আই ব্যাংক এ নাম নথিভুক্ত করে রাখবেন এবং যোগাযোগ করবেন। আর যদি কোনো কারণে এরই মধ্যে কর্নিয়ার অস্বচ্ছতার ধরা পড়ে তখন আর তা প্রতিস্থাপন না করে তরল গ্লিসারিনে সংরক্ষণ করে রাখা হয়।
দুর্ঘটনা বা অন্য কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত চোখের কর্নিয়া-স্ক্লেরা ইত্যাদি মেরামতের কাজে এগুলো ব্যবহৃত হয়। কর্নিয়া প্রতিস্থাপন এর সাফল্য অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে, যেমন- দাতা ও গ্রহীতার কর্নিয়ার অবস্থা, অপারেশনে দক্ষতা, সতর্কতা, অপারেশন পরবর্তী চিকিৎসা ও যত্নের উপর।
মরণোত্তর চক্ষুদান এক মহান সেবা। মৃত্যুর পরে আপনার দেয়া চোখেই অন্য একজন দেখতে পাবে এ জগতের আলো।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url