মৃত্যুক্ষুধা - রহিম মিয়ার বাস্তব গল্প

mrittukhuda

মৃত্যুক্ষুধাঃ

রহিম মিয়া। রহিম মিয়া একজন খেটে খাওয়া দিনমজুর। গরীব হওয়ার কারণে সমাজে তার কোন মূল্য নেই। সবাই তাকে “কামলা রহিম্যা” বলেই ডাকে। এতে তার কোনো যায় আসে না। দুঃখও বোধ করে না সে। খোদা যেন দয়া করেই তার জীবনে দুঃখকে বড় করে দেখার অবকাশ দেননি। তাহলে হয়তো মস্ত বড় এক অঘটন ঘটতো।
রহিম মিয়া দিনে এনে দিনে খায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি কাজ করে কয়েক মুঠো চাল আর এক মুঠো ডাল নিয়েই তাকে ঘরে ফিরতে হয়। এর চেয়ে বেশি কিছু তার ভাগ্যে জোটে না। এভাবেই তার জীবন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের অপেক্ষা করছে।
হঠাৎ রহিম মিয়া অসুস্থ হওয়ায় সেদিন আর কাজে যেতে পারেনি। পরক্ষনেই সে জানতে পারল তার চালের হাঁড়িতে ইঁদুরের দুর্ভিক্ষ নিবারণী সভা বসেছে। তাদের কিচিরমিচির বক্তৃতা আর নেংটা ভলেন্টিয়ারদের হুটুপুটির কারণে ঘরে বসে থাকা তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে তার আট-দশটি ছেলে-মেয়ে যে বিচিত্র সুরে ফরিয়াদ করতে লাগলো ক্ষুধার তাড়নায় তাতে অন্নের মালিক যিনি তিনি আর পাষাণ ব্যতীত সব কিছুই বুঝি বিচলিত হয়।
সন্তানদের ক্রন্দন কাতর কন্ঠ দেখে সে আর ঘরে বসে থাকতে পারেনি। ও তো কোনো ক্রন্দন নয়, ও যেন বিক্ষুব্ধ গণদেবতার পীড়িত মানবত্মার হুংকার।
রহিম মিয়া বেরিয়ে পড়ল কাজের সন্ধানে। যে করেই হোক চাল-ডাল নিয়েই তাকে ঘরে ফিরতে হবে। সন্তানদের ক্রন্দন কাতর কন্ঠ শোনার সামর্থ্য তার নেই। হয়তো অন্য কোন চিত্র তাকে দেখতে হবে আজ।
কিন্তু এ ছিল ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। দিন পেরিয়ে সন্ধ্যা গড়িয়ে অন্ধকার নেমে এল পৃথিবী জুড়ে। তবুও রহিম মিয়ার ভাগ্যে কোন কাজ জুটলো না। রহিম মিয়া এবার মনে মনে ভাবছে আজ হয়তো তাকে অন্য আরেকটি চিত্রের সাক্ষাৎ পেতে হবে।
রাতের আধারে খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হল রহিম মিয়াকে। আর কোন উপায় ছিল না তাঁর। কোনো কথা নেই। দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে বসে আছে রহিম মিয়া। তার ছোট্ট শিশুটি আর কাঁদতে পারছে না- ক্ষুধার তাড়নায় শুধুই ধুঁকছে।
রহিম মিয়া যেন মৃত্যুর পাখার শব্দ শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু অবুঝ শিশুর মত তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার সামর্থ ছিলনা তার। একদিকে মৃত্যু অন্যদিকে ক্ষুধা।
কোনো প্রকার উপায়ন্তর না দেখে এবার রহিম মিয়া প্রতিবেশীর কৃপার অপেক্ষায় বসে আছে। কোনো প্রতিবেশী একটু কৃপা করলে মৃত্যুর পাঞ্জা হয়তো রেহাই পেয়ে যাবে তার ছোট্ট শিশুটি। সামান্য হলেও তার দুঃখ লাঘব হবে। কিন্তু প্রতিবেশীরা যে তাকে মানুষ বলেই মেনে নিতে চায় না, কৃপা করবে কি করে? তার ভাগ্যে কোন খাদ্য জুটলো না। মৃত্যুক্ষুধার যন্ত্রণায় পিতার সামনেই দুনিয়াকে বিদায় জানালো রহিম মিয়ার ছোট্ট শিশুটি।
শিশুর মৃত্যুশোকে প্রভাতের আকাশ বাতাস হাহাকার করে উঠলো, নেই নেই নেই, কেউ নেই তাকানোর। রহিম মিয়া নিরবে কাঁদে আর অন্নের মালিকের দরবারে ফরিয়াদ করে অভিযোগের সুরে বলে মালিক! কোনো ব্যক্তির মহিমার অচলায়তনে নিঃশ্বাস রোধ করে বেঁচে থাকার মায়া অন্তত আমার অন্তরে ছিল না, কোনো দিনই ছিল না।
সন্তানের মৃত লাশ সামনে নিয়ে রহিমিয়া অনুভব করছে বেঁচে থাকার চিহ্ন শ্বাস-প্রশ্বাসটুকু ছাড়া আর কিছুই নেই।
দেহের যেটুকু অবশিষ্ট আছে তা কবরে দেয়া ছাড়া আর কোন কাজে লাগবে না। যেন কুমিরের চিবিয়ে গিলে আবার উগলে দিয়ে গেছে। মৃত্যুক্ষুধা এবার তাকেও তিলে তিলে গ্রাস করতে লাগলো। কসাই যেমন করে মাংস থেঁতলায়। রোগ, শোক, দুঃখ, দারিদ্র এই চারটি মিলে তেমনি করে থেঁতলেছে ওকে। তার সুন্দর পৃথিবী চোখে হঠাৎ মলিন হয়ে উঠল। তার চোখের নদী সমুদ্রে গিয়ে পড়ল। আর মৃত্যুর ক্ষণে অমৃত পান করে সে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে গেল।
কত বড়, কত বিপুল জীবনের স্বপ্ন নিয়ে জন্মেছিল সে। আর কি দুঃখ নিয়েই না চলে গেল। রাজার ঐশ্বর্য নিয়ে সে এসেছিল, সে চলে গেল ভিখারির মতো নিরন্ন, নিঃসহায়, নির্বন্ধু একা।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url